দ্বিতীয় শাহ আলম যিনি ১৬ তম মুঘল সম্রাট ছিলেন।
দ্বিতীয় শাহ আলম এর জন্ম নাম আলী গওহর বা আলী গৌহার। জন্ম ২৫ জুন ১৭২৮ মৃত্যু ১৯ নভেম্বর ১৮০৬। যিনি ছিলেন ষোড়শ মুঘল সম্রাট এবং দ্বিতীয় আলমগির এর পুত্র। তিনি ছিলেন পিতার মনোনীত উত্তরাধিকারী। ব্রিটিশরা তাকে "দিল্লির রাজা" বলে ডাকতেন, ব্রিটিশরা তার মৃত্যুর 30 বছর পর তার নাম বহনকারী মুদ্রা জারি করেছিলেন। দ্বিতীয় আলমগীরের বিবেকবর্জিত উজির গাজীউদ্দিন সম্রাটকে সম্পূর্ণরূপে স্বীয় নিয়ন্ত্রণে এনে আলী গওহরকে কড়া নজরে রাখতেন। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় আধিপত্য বিস্তার করার জন্য ও তাঁর নিজের অবস্থান মজবুত করার উদ্দেশ্যে ১৭৫৯ সালে আলী গওহর দিল্লি থেকে পালিয়ে সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলে চলে আসেন। বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মীরজাফরের জনপ্রিয়তার অভাব তাঁর মনে আশার আলো সঞ্চার করে। সিংহাসনে অধিষ্ঠিত থাকার জন্য মীরজাফর সম্পূর্ণরূপে ব্রিটিশের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। শাহ আলম ও ব্রিটিশের সাহায্য কামনা করেছিলেন, কিন্তু ক্লাইভ মীরজাফরকেই ক্ষমতায় রাখতে আগ্রহী ছিলেন( নিজ স্বার্থে) । ইংরেজ সৈন্যরা শাহ আলমের সৈন্যবাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেন।
দিল্লিতে উজির গাজীউদ্দীনের আরও ষড়যন্ত্রের খবর পেয়ে শাহজাদা দ্বিতীয় শাহ আলম বাংলা থেকে নিজের সৈন্য সামন্ত প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে ইংরেজদের থেকে নিজের নিরাপত্তা ও হেফাজত এবং তাঁর ভরণপোষণের জন্য আর্থিক সাহায্য প্রার্থণা করেন। ক্লাইভ শাহ আলমকে এক হাজার পাউন্ড প্রদান করলে তিনি বাংলা ছেড়ে চলে যান। উজির গাজীউদ্দীনের কারসাজিতে শাহ আলম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সুবাহদারি লাভে ব্যর্থ হন। কিন্তু ১৭৫৯ সালে গাজীউদ্দীন কর্তৃক সম্রাট আজিজুদ্দীন দ্বিতীয় আলমগীর নিহত হলে শাহজাদা আলী গওহর শাহ আলম উপাধি ধারণ করে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করেন। নতুন মুঘল সম্রাট যিনি একদিকে মীরজাফরের এবং অন্যদিকে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামমাত্র প্রভু ছিলেন, সহসা বিহার আক্রমণ করেন। কিন্তু ইংরেজ বাহিনীর নিকট যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেন। রাজধানী ফেরার পথে ব্রিটিশ সৈন্যরা তাঁকে পাটনা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসে। পাটনায় বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নতুন নওয়াব মীর কাসিম তাঁর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎকারে মিলিত হন। বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলম মীর কাসিমকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সুবাহদার হিসেবে অভিষিক্ত করেন এবং বিনিময়ে নওয়াব কর্তৃক বার্ষিক ২৪ লক্ষ টাকা কর প্রদানের প্রতিশ্রুতি আদায় করেন। ১৭৫১ সাল থেকে ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধ পর্যন্ত বাদশাহ শাহ আলম অযোদ্ধার নওয়াব সুজাউদ্দৌলার আশ্রয়ে অতিথিশালয়ে ছিলেন। বক্সারের যুদ্ধের পর সম্রাট শাহ আলম বস্ত্তত অসহায় অবস্থায় নিপতিত হন এবং পুনরায় ইংরেজদের কাছে নিরাপত্তা সাহায্য চান। এলাহাবাদ চুক্তি অনুসারে (১৭৬৫) শাহ আলম বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা বা দেওয়ানি প্রদান করেন। কোম্পানি কোরা ও এলাহাবাদকে বাদশাহর নিয়ন্ত্রণে রাখতে সম্মত হন। বাদশাহ শাহ আলম এলাহাবাদে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি শান্তিতে বাকি জীবন কাটিয়েও দিতে পারতেন। কিন্তু মুঘলদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে তিনি দিল্লিতে ফিরে যেতে চাইলেন। সুযোগও এলো। দিল্লি মারাঠা শক্তির পদানত হলো। মারাঠারা তার পূর্বপুরুষের সিংহাসন দখলের জন্য তাঁকে দিল্লি ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানাল এবং তারা মুগল সম্রাটের অধীনস্থ থেকে তাঁকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও দিলো। সে অনুযায়ী ১৭৭১ সালের মে মাসে শাহ আলম এলাহাবাদ থেকে দিল্লি রওয়ানা হন এবং ডিসেম্বরে দিল্লি পৌঁছেন। দিল্লি গিয়ে তিনি ইংরেজদের সাথে আলাপ করলেন, ইংরেজরা তাঁকে মারাঠাদের উপর নির্ভরশীল না হওয়ার পরামর্শ দেয়। সম্রাট এলাহাবাদ দুর্গে দীর্ঘ ছয় বছর ইংরেজের বন্দি হিসেবে জীবনযাপন করেন( অন্য কোন কারণে) । ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার গভর্নর নিযুক্ত হয়ে এসে সম্রাটকে বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা প্রদানের চুক্তি বাতিল করে দেন এবং এলাহাবাদ ও কোরা অঞ্চলদ্বয় সম্রাটের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে অযোধ্যার নবাবকে প্রদান করেন। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দীউয়ান হিসেবে এর অবনমিত অবস্থান পরিত্যাগ করে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যায় ব্রিটিশ প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ১৭৮৮ সালে সিন্ধিয়া যখন সাময়িকভাবে দিল্লি ছেড়ে যান সেই সুযোগে গোলাম কাদের নামে এক আফগান শাহ আলমের চক্ষু উৎপাটন করে তাঁকে অন্ধ করে দেয়। তিনি রোহিলাদের প্রধান (ভারতে বসতি স্থাপনকারী যুদ্ধপ্রবণ আফগান উপজাতি), গোলাম কাদির দিল্লী দখল করেন এবং গুপ্তধন খুঁজে পেতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে শাহ আলমকে অন্ধ করে দেন। শাহ'আলম তার শেষ বছরগুলি মারাঠা প্রধান সিন্ধিয়ার সুরক্ষায় এবং দ্বিতীয় মারাঠা যুদ্ধের (1803-05) পরে ব্রিটিশদের সুরক্ষায় কাটিয়েছিলেন। ইউরোপে ফ্রান্সের সম্ভাব্য আক্রমণের মুখে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ হিসেবে ভারতে ব্রিটিশরা শাহ আলমের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে। ব্রিটিশরা এই ভেবে চিন্তিত হয় যে, ফ্রান্স তার সাম্রাজ্যবাদী স্পৃহা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ভারতে ফরাসি সামরিক অফিসারদের সহায়তায় মারাঠাদের দমন করে ফরাসি স্বার্থে বাদশাহকে ব্যবহার করবে। ১৮০৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ বাহিনী দিল্লি প্রবেশ করলে জরাজীর্ণ চাঁদোয়ার নিচে আসীন বৃদ্ধ অন্ধ মুঘল সম্রাট শাহ আলম ইংরেজ শক্তির আশ্রয় লাভ করেন। তখন মুঘল বাদশাহর এমন কোন সামরিক শক্তি ছিল না যা দিয়ে তিনি তাঁর ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে পারতেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি তৈমুরের সম্মানিত বংশধর হিসেবে সমগ্র দেশে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তখনও নওয়াব ও সুবাহদারগণ সিংহাসনে আরোহণ করে তাঁর অনুমোদন বা স্বীকৃতি প্রার্থনা করতেন এবং সম্রাট প্রদত্ত যে কোন উপাধিকে গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়ন করতেন। এসকল নওয়াব সুবাহদার তাঁর নামে মুদ্রাঙ্কণ করতেন এবং তাঁর নামে খুতবা পাঠ করাতেন। তখন পর্যন্ত ব্রিটিশরা সরাসরি ভারতবর্ষের সার্বভৌমত্ব দাবি করার মতো শক্তি অর্জন করতে না পারায় শাহ আলমকে তাঁর মৃত্যুর (১৮০৫) পূর্ব পর্যন্ত নামমাত্র সম্রাট হিসেবে বহাল রাখে । দ্বিতীয় শাহ আলম সংস্কৃতি মনা ছিলেন, তার নিজস্ব কবিতা সমগ্র দিয়ে দিওয়ান (কবিতা) রচনা করেন এবং আফতাব ছদ্মনামে সেই কবিতা গুলো প্রকাশ করেন।
তাঁর কবিতাগুলো মির্জা ফাখির মাকিন পরিচালিত, সম্পাদিত,সংকলিত ও সংগৃহীত । শুধুমাত্র তার প্রাসাদের অভ্যন্তরে ক্ষমতা দিয়ে, তিনি তার কোষাগারে এক মিলিয়ন টাকারও বেশি সঞ্চয় করেছিলেন।
আরো ভালো সমৃদ্ধ তথ্য পেতে নিচের ৫ টি বই পড়তে পারেন ⤵️
(1) the relentless rise of the East India Company
(2) Delhi Past and Present
(3) Advanced Study in the History of Modern India
(4) Muslim Civilization in India।
(5) Dictionary of Indo-Persian Literature ।
== 0 ==
দ্বিতীয় শাহ আলম: ১৬ তম মুঘল সম্রাট
রাজত্ব: ১০ অক্টোবর ১৭৬০-১৯ নভেম্বর ১৮০৬ খৃষ্টাব্দ
রাজ্যাভিষেক: ১০/১০/১৭৬০
পূর্বসূরি: তৃতীয় শাহজাহান
উত্তরসূরি: দ্বিতীয় আকবর
জন্ম: আলী গওহর শাহ আলম ২৫ জুন, ১৭২৮ শাহজাহানাবাদ, দিল্লী।
মৃত্যু: ১৯ নভেম্বর, ১৭৫৯ ( বয়স ৭৮ )
শাহজাহানাবাদ,দিল্লী
সমাধি: লাল কেল্লা
দাম্পত্য সঙ্গী: ৫ জন
বংশধর: ১৮ জন (১৬ জন ছেলে , ২জন মেয়ে)
পূর্ণ নাম: আবদুল্লাহ জালালুদ্দিন আবুল মুজাফ্ফর হামদ উদ্দীন মুহাম্মদ আলী গওহর শাহ আলম দ্বিতীয়
প্রাসাদ: হাউস অব তিমুর
রাজবংশ: মুঘল সাম্রাজ্য
পিতা: দ্বিতীয় আলমগীর
মাতা: নওয়াব জিনাত মহল
ধর্ম: সুন্নি ইসলাম.
• Now Online ==>1 • Today's Visite ==>1 • Total Visitore ==>1 • My Time Zone ==>16:15 • Date (en) ==>15/03/26 • You Are From ==> • Ip Address ==>216.73.216.215 • Your Browser ==>Mozilla/5.0 Your Device •